সুপর্ণ সরকার
বেতাল অষ্টাবিংশতি
Available Book Type
Paper Book
Book Info:
বেতাল অষ্টাবিংশতি
সুপর্ণ সরকার
৳ 280.00
বিক্রমাদিত্য আর বেতালের গল্প আমরা ছোটবেলা থেকে শুনে এসেছি। কিন্তু কখনো ভেবে দেখেছেন, এই গল্পগুলোর পেছনে কি সত্যিই কোনো ইতিহাস লুকিয়ে আছে? যদি জানা যায়, বেতাল আজও আছে? এই পঁচিশটি কাহিনী ছাড়াও আরও কাহিনী আছে যা সময়ের স্রোতে হারিয়ে গিয়েছিল?
এই উপন্যাসিকা পাঠককে এমন এক জায়গায় দাঁড় করিয়ে দেয়, যেখানে প্রতিটি গল্পের অন্তরালে লুকিয়ে থাকে আরও গভীর এক সত্য।
“বেতালের মৃত্যু নেই” পাঠককে আমন্ত্রণ জানায় সেই সত্যের সন্ধানে…
বিস্তারিত
বিক্রমাদিত্য আর বেতালের গল্প আমরা ছোটবেলা থেকে শুনে এসেছি। কিন্তু কখনো ভেবে দেখেছেন, এই গল্পগুলোর পেছনে কি সত্যিই কোনো ইতিহাস লুকিয়ে আছে? যদি জানা যায়, বেতাল আজও আছে? এই পঁচিশটি কাহিনী ছাড়াও আরও কাহিনী আছে যা সময়ের স্রোতে হারিয়ে গিয়েছিল?
এক বৈশাখের দুপুরে শুভ্রকে শান্তিনিকেতনে ডাকে তার বন্ধু মিহির। পৌঁছে শুভ্র জানতে পারে বিস্ময়কর এক খবর: ইংল্যান্ডের এক নির্জন চার্চের বইয়ের দোকানে মিহির আবিষ্কার করেছে ১২৯২ খ্রিস্টাব্দে ভারতে আগত ইউরোপীয় মিশনারি জিওভানির পুরাতন ডায়েরি। সেখানে লেখা আছে বেতালের তিনটি অজানা কাহিনীর কথা; যা অনুলিখন করেছিলেন ইতিহাসের কিংবদন্তিতূল্য ব্যক্তিত্বরা।
এই আবিষ্কার শুভ্র ও মিহিরের সামনে খুলে দেয় এক ভিন্ন জগতের দরজা। ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয় বেতাল কোনো ভয় দেখানো প্রেত নন; তিনি অমর জ্ঞানী অতিলৌকিক সত্তা, যুগে যুগে খুঁজে বেড়ান তাঁর যোগ্য সঙ্গী ও শ্রোতা। কিন্তু দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত বিক্রমাদিত্যের শেষ সময়ে বেতাল যে বুদ্ধির পরীক্ষা শুরু করেছিল, তাতে সসম্মানে কে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন?
কিংবদন্তি, ইতিহাস, গুপ্ত সাম্রাজ্যে ভর করে এগিয়ে যায় কাহিনি। একে একে খনা, বসুবন্ধু ও কালিদাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক চরিত্ররা এসে হানা দেয়। গল্পের জট খুলতে খুলতে এই উপন্যাসিকা পাঠককে এমন এক জায়গায় দাঁড় করিয়ে দেয়, যেখানে প্রতিটি গল্পের অন্তরালে লুকিয়ে থাকে আরও গভীর এক সত্য।
“বেতালের মৃত্যু নেই” পাঠককে আমন্ত্রণ জানায় সেই সত্যের সন্ধানে…
পাঠকের প্রতিক্রিয়া
3 reviews for বেতাল অষ্টাবিংশতি
একই রকম আরো কিছু বই
Related products
তোমাদের গল্প
উপন্যাসদ্য টেস্ট
থ্রিলারপ্রজেক্ট টেট্রা মহাজাগতিক
সায়েন্স-ফিকশন





Sachitro Ganguli –
গত ২৪শে মার্চ, বেতাল এসেছিল আমার কাছেও। যশোরের হরিদাসকাটি গ্রামে বসে যখন আমি অবকাশ কাটাচ্ছি, হাতে নিয়েছি বইমেলা থেকে কেনা একটা বই। ‘বেতাল অষ্টাবিংশতি’। নাম দেখে বিস্মিত হয়েছিলাম আমি। অষ্টাবিংশতি কেন? পঞ্চবিংশতি শুনেছি এতদিন। সৌভাগ্য নাকি দুর্ভাগ্য জানি না, ৫টি তেঁতুল গাছের মধ্যিখানে ১টি শিরীষ গাছও ছিল আমার দিদাবাড়ির ওই গ্রামে। হঠাৎ একটা কর্কশ কণ্ঠ বলে উঠল,
“সচিত্র, তুমি সঠিক পুস্তকই পেয়েছ। লেখক সুপর্ণ কালের গর্ভে হারিয়ে যাওয়া আমার বাকি ৩টি কাহিনী পুস্তক রূপে প্রকাশ করেছেন। এবার আমি তোমার উপর ভার দিলাম। এই পুস্তক পাঠ করে, এর সম্পর্কে অবগত কর অন্যদের”। সাথে সাথে চমক ভাঙলো আমার। বইয়ের নাম পড়ে বোধ হয় আমার হ্যালুসিনেশন হয়েছিল।
যাই হোক, ছোটকাল থেকেই আমরা বিক্রম-বেতালের সঙ্গে পরিচিত। বইটা আমি এক বসাতেই শেষ করেছি। কী অনবদ্য রচনা! আমার ইতিহাস, থ্রিলার ভালো লাগে। ভালো লাগে অতিপ্রাকৃত সব বস্তু। সবকিছুর সমষ্টি এই বই। আর ষোলকলা পূর্ণ হয়েছে গবেষণাধর্মী লেখা হওয়ায়। বইটি থেকে জানলাম বেতালের সাক্ষাৎ হয়েছিল মহিয়সী নারী খনার সঙ্গেও। কে কখন বেতালকে নিয়ে লিখেছেন তাও বিস্তর বলা আছে। আরও আছে, বেতালের বিক্রমাদিত্য নির্বাচনের কথা। বাকি ৩টি কাহিনীই এই উপন্যাসিকার প্রতিপাদ্য। যা বিদ্যাসাগরের লেখা কাহিনীগুলো থেকে একটু ভিন্ন।
মোদ্দা কথা, বইটি থেকে আপনারা প্রচুর তথ্য পাবেন। লেখকের লেখার ধরন যথেষ্ঠ মনোমুগ্ধকর। শেষ পর্যন্ত পাঠককে টেনে ধরে রাখতে সক্ষম। পৃষ্ঠা সংখ্যা মাত্র ১১০। বইটিতে বিভিন্ন সংস্কৃত ও তৎসম শব্দের ব্যবহারে, মাঝে মাঝে মনে হবে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের লেখা পড়ছেন। তবে লেখা একদমই দুর্বোধ্য নয়। লেখক এবং ঋদ্ধ প্রকাশকে ধন্যবাদ দিতে চাই বইটির লেখা ও চমৎকার প্রোডাকশনের জন্য। বইটি যেহেতু আমার প্রিয় বইগুলোর তালিকায় যুক্ত হয়েছে, তাই ১০ এ ১০ দিতে কোনো দ্বিধা নেই।
বইটা বন্ধ করার মুহূর্তেই চোখ গেল, সেই শিরীষ গাছের নিচের দিকের একটা ডালে। এ কি! বড় সাদা বাদুড় সদৃশ, হাসি হাসি মুখ, চোখ জ্বল জ্বল করছে, কী ও? উঠে দাঁড়াতেই উড়াল দিল অদ্ভুত ওই প্রাণী। হ্যাঁ, তিনি তো রূপ পরিবর্তন করতে পারেন। তাহলে শিরীষ গাছ—হেঁট মুখে ঝুলন্ত জীব—সহাস্য মুখ…..আর, আর ঐ তীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বর? তাহলে কি স্বয়ং প্রেতসম্রাট আমাকে দিয়ে বইটি পড়ালেন? তাই যদি হয়, তবে বইটি সম্পর্কে আপনাদেরকেও জানালাম। বেতালের আদেশ আমি কীভাবে অমান্য করি?
Yeamin Abir –
বেতাল আসলে কে?
আমাদের পড়া বিভিন্ন বাংলা অতিপ্রাকৃত বা ভয়ের গল্পে আমরা বেতালকে দেখে থাকি এক ক্ষতিকর সত্ত্বা হিসেবে যে বিভিন্নভাবে মানবজাতির উপরে আঘাত হেনে থাকে।
আবার আমরা দেখতে পাই রাজা বিক্রমাদিত্যের সাথে থাকা এক বেতালকে যে তার জ্ঞান এবং ধী এর মাধ্যমে বারবার আমাদের অভিভূত করে।
তাহলে বেতাল আসলে কেমন সত্ত্বা?
লেখক সুপর্ণ সরকার তার বই “বেতাল অষ্টাবিংশতি” তে দিয়েছেন এর এক চমৎকার উত্তর। তিনি ভ্যাম্পায়ার এবং কাউন্ট ড্রাকুলার তুলনার মাধ্যমে দেখিয়েছেন যে কাউন্ট ড্রাকুলা সংজ্ঞা অনুযায়ী ভ্যাম্পায়ার হলেও সব ভ্যাম্পায়ার কাউন্ট ড্রাকুলা নয়। সেরকম আমাদের পড়া বিভিন্ন হরর গল্পের বেতাল চরিত্রগুলো মানবজাতির জন্য ক্ষতিকর হলেও রাজা বিক্রমাদিত্যের বেতাল তাদের থেকে আলাদা এক সত্ত্বা যে অমর,অবিনশ্বর,তার বুদ্ধি ও জ্ঞান তাকে করে তুলেছে আরও অভেদ্য।
বেতাল অষ্টাবিংশতি বইয়ের মূল কাহিনী আসলে কী? আমরা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এর অনুবাদকৃত বেতাল পঞ্চবিংশতি বা বেতালের ২৫ কাহিনী এর সাথে অনেকেই পরিচিত। কিন্তু বেতাল অষ্টাবিংশতি বইয়ে লেখক সুপর্ণ সরকার নিয়ে এসেছেন বেতালের হারিয়ে যাওয়া আরও তিন কাহিনী। আরও তিন বুদ্ধির খেলা যা পাঠককে আরেকবার নিয়ে যাবে বেতালের সেই রহস্যময় দুনিয়ায়। সাথে খোঁজা হয়েছে বেতালের শুরুর গল্প, বেতালের গল্পের উৎস, সে সময়কালের জীবনব্যবস্থা এবং সাথে কিছুটা ইতিহাস।
লেখক বই শুরু করেছেন বিদ্যাসাগর রচিত বেতাল পঞ্চবিংশতি বইয়ের কিছু অংশ সাধু ভাষা থেকে চলিত ভাষায় নিজের মতো করে রূপান্তর করে। এই অংশে উঠে এসেছে বেতালের অরিজিন স্টোরি বা শুরুর কাহিনী। যারা বেতাল পঞ্চবিংশতি পড়েছেন, তারা চাইলে এই অংশটুকু স্কিপ করে গেলেও কিছু মিস করবেন না।তবে লেখকের এই সাধু থেকে চলিত ভাষায় করা ট্রান্সফরমেশন ছিলো চমৎকার ও সাবলীল।
এই কাহিনী যেমন বেতাল এর, একইভাবে এই কাহিনী বর্তমান সময়ের দুই বন্ধু শুভ্র এবং মিহিরেরও। মিহিরের কাছে আছে ইতালিয়ান এক মিশনারি জিওভানির ডায়েরি যেখানে তিনি লিপিবদ্ধ বা copy করে রেখে গেছেন বেতালের আরও তিনটি কাহিনী। এই কাহিনী পড়ার আগে মিহির এবং শুভ্র এর মধ্যে বেতাল নিয়ে তর্ক-বিতর্ক এবং একইসাথে তাদের কথোপকথনে উঠে আসে বেতালের গল্পসমূহের উৎসের গল্প। সেই গল্পের মাধ্যমে পাঠক ইতিহাসের ডানায় চড়ে বেতালের দুনিয়ায় প্রবেশ করে। শুভ্র-মিহিরের চরিত্র দুটো বইয়ে তুলনামূলক কম সময়ের জন্য উপস্থিত ছিলো, ফলে চরিত্র হিসেবে তারা খুব বেশি বিল্ডআপ পায়নি কাহিনীতে। তবে বেতালের দুনিয়ায় প্রবেশের জন্য তারা ছিলো মূল চাবি।
লেখক সুপর্ণ সরকার বইয়ে বেতালের শুরুর কাহিনী,বেতালের গল্পের উৎস, শুভ্র-মিহির এর বেতাল নিয়ে তর্কের মাধ্যমে ইতিহাস উঠিয়ে আনলেও এই বইয়ের মূল বিষয়বস্তু বা মূল essence ছিলো বেতালের হারিয়ে যাওয়া ঐ তিনটা গল্প। পুরো বইয়ের কাহিনী ছিলো একপাশে, আর লেখকের বর্ণনাকৃত হারিয়ে যাওয়া তিন বেতাল কাহিনী ছিলো তার থেকে আরও অনেক উঁচুতে। লেখক কাহিনীগুলোতে নিয়ে এসেছেন চিরচেনা সেই বেতালকে যে বুদ্ধির খেলায়,প্রশ্নের প্যাচে কুপোকাত করতে সিদ্ধহস্ত। সাথে লেখক আরও এনেছেন সে সময়ের এক বিখ্যাত মহাকবিকে যাকে নিয়ে আমরা এখনও আলোচনা করি এবং গ্রাম-বাংলার মানুষের অনেক কাছের এক নারী সাহিত্যিককে যার বচন সাহিত্য হিসেবে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এক সম্পদ।
এই বইয়ের মাধ্যমে লেখক পাঠকের সামনে বেতালের চিরচেনা ভয়াল রূপ ভেঙে উপস্থাপন করেছেন এক মানবিক অতিপ্রাকৃতিক সত্ত্বা হিসেবে, যে মূলত বুদ্ধিতে,প্রজ্ঞায় তার সমকক্ষ বিক্রমাদিত্যকে খুঁজে বেড়ায়। লেখক বেতালের শুরুর গল্প তুলে ধরেছেন নতুন ভাবে। সেই গল্প থেকে তার উদ্দেশ্যগুলো জানা যায় আরও নিখুঁতভাবে,আরও বিশ্বাসযোগ্যভাবে।
এতোকিছু আলোচনা হলেও বইয়ের পৃষ্ঠাসংখ্যা ছিলো মাত্র ১১০। এই ১১০ পেজের ছোট আঙিনায় লেখক দারুণ মুন্সীয়ানায় নিয়ে এসেছেন অতীতের বেতাল ও তার দুনিয়া এবং বর্তমানের শুভ্র-মিহিরকে। সাথে ইতিহাস ও চমৎকার ইনফো-ডাম্পিং তো ছিলোই। এই ছোট বইটা পড়ে খুব তাড়াতাড়ি শেষ করে ফেলতে পারবেন, কিন্তু এই বইয়ের রেশ থেকে যাবে অনেকদিন যাবৎই।
তো যারা অতিপ্রাকৃত জনরায় নতুন কিছু পড়তে চান, শুধু ভয় নয়, বুদ্ধির খেলা আর ইতিহাসের ডানায় চড়ে যারা ঘুরে আসতে চান, চেনা পরিচিত হাজার বছরের পুরাতন এক সত্ত্বার সাথে যদি নতুন করে পরিচিত হতে চান, তাহলে হাতে তুলে নিতে পারেন “বেতাল অষ্টাবিংশতি”। সময়টা খারাপ কাটবে না কিন্তু!
Zakaria Minhaz –
সত্যি বলতে কী বেতাল সম্পর্কিত কোনো কিছু এর আগে আমার পড়া হয়নি। নাম শুনেছি, কিন্তু পড়িনি। তবে ঋদ্ধ প্রকাশ যেহেতু কন্টেন্টের ওপর জোর দেয় বেশি, তাই ভাবলাম অন্তত পড়ে দেখা যায়। ছোট বই, ভালো না লাগলেও সময় বেশি নষ্ট হবে না। তবে আমাকে বলতেই হচ্ছে এটা মোটেও সময় নষ্ট করা বই মনে হয়নি। উলটো এক বসায় একটানা পড়ে শেষ করেছি। বইটার দুটো অংশ আছে। ঐতিহাসিক অংশ এবং বেতালের গল্প। আর এই দুটো জায়গাই আমার খুবই ভালো লেগেছে।
বেতালের ইতিহাস
বইয়ের একদম শুরুতেই পাঠককে “বেতাল” কে কিংবা তার মূল কাহিনিটা আসলে কী-সে ব্যাপারে একটা বিশদ ধারণা দেওয়া হয়। আমার মতো নাদান পাঠকদের, যাদের বেতাল সম্পর্কে ইতোপূর্বে কোনো ধারণাই ছিল না; তাদের জন্য এই অংশটা রীতিমতো আশীর্বাদ। সরাসরি গল্পে চলে গেলে আমার মতো খানিকটা খুঁতখুঁতে স্বভাবের পাঠকেরা বরং হিমশিম খেয়ে যেতাম। তো, উজ্জয়িনী নগরের বিক্রামাদিত্য কীভাবে বেতালের সন্ধান পেল? কিংবা বেতাল কীভাবে বেতাল হলো সেই গল্পটা জানা যায় এখান থেকে। তবে বেতালের ইতিহাস শুধু এখানেই থেমে থাকে না। বইয়ের মূল গল্পে বরং বেতালের গল্পগুলো কোথা থেকে কীভাবে এল সেই ইতিহাস আরও ভালোভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বাংলা ভাষায় অনুবাদ করে বাংলা ভাষাভাষী পাঠকদের মধ্যে জনপ্রিয় করেছিলেন বেতালকে। কিন্তু বেতাল পঞ্চবিংশতির অরিজিনাল লেখক আসলে কে? গল্পে গল্পে সেটাই তুলে এনেছেন লেখক এখানে। সাথে রয়েছে এসব ইতিহাসের বেশ কিছু রেফারেন্স৷ লেখক যে ভালো পরিমাণে পড়াশোনা করেছেন বইটা লেখার আগে তা স্পষ্ট বুঝা যায়। পৈশাচিক ভাষা নামে এক ধরণের ইন্দো-আর্য ভাষা যে ভারতবর্ষে প্রচলিত ছিল তা এই প্রথম জানলাম এই বইয়ের সুবাদে। শুভ্র ও মিহির নামের দুই বন্ধুর কথোপকথনে আরও উঠে আসে প্রাচীন ভারতের কিছু ইতিহাস। খুবই স্বল্প পরিসরে, তবে এতে করে সেসব ইতিহাস সম্পর্কে আরও বেশি জানার আগ্রহ তৈরি হয়। প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে শুরু হওয়া বেতালের এই গল্পের ইতিহাস অল্প কথায় তুলে আনা মোটেও সহজ কাজ নয়। কিন্তু সে কাজটা খুবই দক্ষতার সাথে করেছেন লেখক। যথারীতি সাথে রয়েছে ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে যাওয়া কিছু অমীমাংসিত প্রশ্ন।
বেতালের প্রশ্ন, বেতালের উত্তর
এবার শুরু হয় বইয়ের মূল গল্প অর্থাৎ বেতালের কাহিনি। রাজা বিক্রমাদিত্যের মৃত্যুর পর কে হবে বেতালের পরবর্তী প্রভু? বিক্রমাদিত্যের তিন সন্তান। বেতাল কোন নতুন বিক্রমাদিত্যকে আড়াল থেকে সাহায্য করবে সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে এই তিন সন্তানের পরীক্ষা নেওয়ার মাধ্যমে। পরীক্ষা নিবে স্বয়ং বেতাল নিজে। আর সেই পরীক্ষা চাক্ষুস করে তা লিপিবদ্ধ করার দায়িত্ব চেপেছে কবি কালিদাসের ওপর! কালিদাসের বয়ানে বেতালের পরবর্তী তিন কাহিনি সম্পর্কে জানা হবে পাঠকের। সাথে থাকবে ভয়াল দর্শন বেতালের বর্ণনা। এক কথায় চমৎকার লেগেছে এই গল্পগুলো। পাশাপাশি যে আবহ তৈরি করেছেন লেখক সেটাতেও মুগ্ধ হয়েছি।
(হালকা স্পয়লার। যারা বইয়ের পুরোপুরি স্বাদ আস্বাদন করতে চান তারা এটুকু অংশ এড়িয়ে যেতে পারেন)
প্রথম গল্প, অনেক কাল আগে অনন্তপুর রাজ্য শাসন করত এমন এক রাজা যাকে কেউ কখনো দেখেনি। এক পর্যায়ে প্রশ্ন উঠল জনমনে, আদৌ তাদের রাজা বলে কেউ আছে কি? নাকি সেনাপতি কিংবা রাজমাতা নিজেই রাজার আদেশ নাম দিয়ে রাজ্য পরিচালনা করছে? অবশেষে নেওয়া হলো পরীক্ষা। পরীক্ষার ফলাফলে এল তিনটে উত্তর। বিক্রমাদিত্যের জ্যেষ্ঠ পূত্র কুমারগুপ্তকে বের করতে হবে তিনটে উত্তরের মধ্যে কোনটা সঠিক? আমি নিজে সামান্য সময় ধরে উত্তরগুলো নিয়ে ভাবলেও সঠিক জবাব বের করতে পারিনি। তবে বেতালের উত্তরটা পছন্দ হয়েছে। বিশ্বাসে মেলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর।
দ্বিতীয় গল্পটা তিনটে রাজ্যের মধ্যেকার শান্তিচুক্তি ভেস্তে যাওয়ার গল্প। এই গল্পের প্রশ্নগুলো একটু কঠিন। কারণ বিচারকের রায়ের ভালো ও মন্দ দুটো দিকই রয়েছে। তবে শেষে গিয়ে বেতাল যে ব্যাখ্যা দেয় তা সুন্দর লেগেছে।
তৃতীয় গল্প রাজ্যের একমাত্র রাজকুমারী প্রভাবতীগুপ্তের জন্য৷ তবে প্রভাবতী নিজেকে নিজেই চ্যালেঞ্জ করে বসে। সে তার ভাইদেরকে করা প্রশ্নগুলোর উত্তর আগে দিতে চায়। যদি সেগুলোতে সফল হয়, তবেই দিবে নিজের জন্য বরাদ্দকৃত প্রশ্নের জবাব। আর এখানে এসে আগের দুই গল্পের সমাপ্তি বদলে যায়। প্রভাবতীর কল্যানে আমরা একই সমাধানের নতুন একটা রূপ দেখতে পাই। এটা দিয়ে প্রকাশ হয় আমাদের জানা ও মেনে নেওয়ার মাঝেও থেকে যায় অনেক ফাঁকফোকর। সে যাই হোক, রাজকন্যার জন্য রাখা তৃতীয় গল্পটা একটা প্রেমের কিংবা পরকীয়ার গল্প। যেখানে রাজার দরবারে যজ্ঞ করতে এসে রানীর প্রেমে পড়ে যায় এক তপস্বী। কিন্ত তাদের প্রেমে থাকে না কোনো কামনা, হয় না কোনো দৈহিক সম্পর্ক। এক পর্যায়ে তপস্বী চলে যায় রানীকে রেখে। কিন্তু রানী বাকি জীবন সংসার ধর্ম করে গেলেও, মন তার পড়ে থাকে সেই তপস্বীর কাছে। প্রশ্ন আসে, তাহলে কি একে পরকীয়া বলা যায়? যদি মিলন না হয়, তবে প্রেম কি পাপ? এই প্রশ্নের জবাব দিয়েই অবশেষে ফুরায় বেতালের অষ্টাবিংশতি। তবে আমাদের বইয়ের গল্প তখনো অনেকটা বাকি রয়ে গেছে।
বেতাল ও খনার কাহিনী
বইয়ের এই শেষ ভাগে বেতালের সাথে খনার পরিচয়, খনাকে দেওয়া বেতালের অভিশাপ ও আশীর্বাদ দুটোই গল্পের ছলে জানানো হয়। এই খনা সেই খনা, যার বচন আজও আমাদের সমাজে প্রচলিত। এর পাশাপাশি রয়েছে খনাকে বলা বেতালের গল্প, যা বইয়ের সবচেয়ে বড় গল্প। সেটা না হয় আর নাইই বলি। বইয়ের শেষটা হয় আরও সামান্য কিছু ইতিহাস ও অমীমাংসিত প্রশ্ন রেখে।
ব্যক্তিগত রেটিং: ০৮/১০ (বেতালের আগের কোনো কাহিনী আমি পড়িনি। তবে ছোট্ট এই বইটিতে লেখক যেভাবে অনেক তথ্য, ইতিহাস ও গল্পের সন্নিবেশ ঘটিয়েছেন তা আমার অসম্ভব ভালো লেগেছে৷ আমার মনের খোড়াক মেটাবার মতো সকল উপাদানই বইটিতে ছিল। পাশাপাশি ঋদ্ধ প্রকাশের দারুণ সব ইলাস্ট্রেশন বইটি পড়ার অভিজ্ঞতা আরও সুন্দর করেছে।)